• ঢাকা, বাংলাদেশ বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০২:৩৩ অপরাহ্ন
  • [কনভাটার]

আত্মহনন ও অপমৃত্যুমুক্ত ঠাকুরগাঁও গড়তে চাই সমন্বিত সামাজিক জাগরণ

সংবাদদাতার নাম / ৫০ ভিজিটর
সময় : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও।
ঠাকুরগাঁওয়ে জেলা প্রশাসন ও ওয়ার্ল্ড ভিশনের যৌথ উদ্যোগে আত্মহত্যা ও অপমৃত্যু প্রতিরোধে দিনব্যাপী যে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা কেবল একটি সাধারণ আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়, বরং সময়ের এক জরুরি ও সতর্কবার্তা।

বর্তমান সমাজে আত্মহত্যা ও অপমৃত্যুর ক্রমবর্ধমান হার আমাদের এক চরম সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও প্রগতিশীল সমাজের জন্য এই প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই নীরব মরণব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে এবং অকালে ঝরে যাওয়া প্রতিটি তাজা প্রাণকে রক্ষা করতে এখনই সর্বস্তরের সমন্বিত উদ্যোগ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

কর্মশালায় উপস্থিত জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—পারিবারিক কলহ, তীব্র মানসিক চাপ, মাদকাসক্তি, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, হতাশা এবং সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয় মানুষকে আত্মহননের মতো চরম ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমাদের বাহ্যিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য যে কতটা ভঙ্গুর ও একা হয়ে পড়ছে, চারপাশের এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তারই অশুভ ইঙ্গিত দেয়। আমরা প্রায়শই শারীরিক অসুস্থতা বা বাহ্যিক সমস্যা নিয়ে যতটা বিচলিত হই, মানসিক স্বাস্থ্যকে ততটাই অবহেলা করি বা লোকলজ্জার ভয়ে আড়াল করে রাখি। এই সামাজিক ট্যাবু বা অন্ধত্ব থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে।

একটি সুস্থ ও আত্মহত্যামুক্ত সমাজ বিনির্মাণে সবার আগে প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর সংস্কার। পরিবারকে হতে হবে প্রতিটি মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ, ভরসাযোগ্য ও ভালোবাসার আশ্রয়স্থল। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং স্পর্শকাতর বয়সের ছেলে-মেয়েরা যখন তীব্র মানসিক চাপ, একাকীত্ব বা হতাশায় ভোগে, তখন তাদের ওপর বাড়তি প্রত্যাশার চাপ সৃষ্টি না করে, কিংবা তিরস্কার না করে, সহানুভূতিশীল ও বন্ধুর মতো আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় একটুখানি মনোযোগ, একটুখানি গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা এবং সহমর্মিতাই পারে একজন মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে।

এর পাশাপাশি, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কেবল জিপিএ-৫ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ফলের পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও জীবনমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একই সাথে, প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে যেখানে অজ্ঞতা বা সচেতনতার অভাবে অপমৃত্যুর হার বেশি, সেখানে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে তৃণমূল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। মাদকের নীল দংশন যেভাবে তরুণ সমাজকে আত্মহননের দিকে ধাবিত করছে, তার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে যেমন কঠোর হতে হবে, তেমনি সামাজিকভাবেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসন ও সহযোগী সংস্থাগুলো এই সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে, যা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালার আলোচনা ও সুপারিশ যেন শুধু চার দেয়ালের ভেতরে কিংবা ফাইলের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে; এর কার্যকর বাস্তবায়ন দেখতে চাই আমরা মাঠ পর্যায়ে।

এখানেই বড় দায়িত্ব চলে আসে আমাদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা এবং সর্বোপরি গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর। যার যার অবস্থান থেকে এই সচেতনতামূলক বার্তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, বরং এটি একটি পরিবারকে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু করে দেয়—এই বোধটি সবার মনে গেঁথে দিতে হবে।

একটি জীবনও যেন অকালে, কোনো অপমৃত্যুর মিছিলে হারিয়ে না যায়—সেটি নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। আসুন, হতাশা ও অন্ধকারের বিপরীতে সহমর্মিতা ও আশার আলো ছড়াই, জীবনকে ভালোবাসতে শিখি এবং সবাই মিলে একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ ঠাকুরগাঁও গড়ে তুলি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ দেখুন